টাকায় কেন লেখা থাকে ‘চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে’

 

 

টাকা আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অপরিহার্য সঙ্গী। বাজারে যাই, বিল পরিশোধ করি, কিংবা হাতে নোট নিয়ে ভাঙতি খুঁজি—প্রতিটি মুহূর্তেই আমরা টাকার ওপর নির্ভর করি। কিন্তু নোটের গায়ে লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাক্যের দিকে অধিকাংশ মানুষেরই দৃষ্টি যায় না। সেটি হলো—“চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে।” কেন এই বাক্য নোটে থাকে? কেন সব নোটে থাকে না? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের টাকার আসল কাঠামো বুঝতে হয়। এই ছোট্ট বাক্যটি কেবল মুদ্রণের অংশ নয়; এটি রাষ্ট্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং জনগণের পারস্পরিক আস্থার প্রতীক।

বাংলাদেশে প্রচলিত টাকা দুই ধরনের—সরকারি মুদ্রা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক নোট। ১, ২ ও ৫ টাকার নোট বা কয়েনকে সরকারি মুদ্রা বলা হয়। এগুলোর ওপর স্বাক্ষর থাকে অর্থ সচিবের। এগুলোই হলো টাকার মূল ভিত্তি, যাকে অর্থনীতির ভাষায় বেস মানি বলা হয়। এই মুদ্রার মূল্য রাষ্ট্র সরাসরি নিশ্চয়তা দেয়। অন্যদিকে ১০ থেকে ১০০০ টাকার নোটগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক ইস্যু করে এবং গভর্নর স্বাক্ষর করেন। এগুলো প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের প্রতিশ্রুতিপত্র, অর্থাৎ বিল অব এক্সচেঞ্জ। এ কারণেই এই নোটগুলোকে মূল মুদ্রা বলা হয় না, বরং ‘ব্যাংক নোট’ বলা হয়।

ব্যাংক নোট মূলত জনগণের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়। আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক যত টাকার নোট বাজারে ছাড়ে, তার সমপরিমাণ সরকারি মুদ্রা, স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা বা রাষ্ট্রীয় সিকিউরিটি ভল্টে সংরক্ষণ করতে বাধ্য। এই রিজার্ভই জনগণকে নিশ্চিত করে যে নোটগুলো প্রকৃত সম্পদের প্রতিনিধিত্ব করছে। তাই ১০–১০০০ টাকার নোটের গায়ে লেখা হয় “চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে।” এর অর্থ দাঁড়ায়—যে ব্যক্তি নোটটি বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়ে যাবে, তার চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক তাকে সমমূল্যের সরকারি মুদ্রা বা সম্পদ দিতে বাধ্য।

এই প্রতিশ্রুতির ইতিহাস বহু পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে ব্যাংক নোট ছিল স্বর্ণের বিনিময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতিপত্র। মানুষ চাইলে নোট জমা দিয়ে স্বর্ণ নিতে পারত। যদিও এখন স্বর্ণে রূপান্তর বাধ্যতামূলক নয়, তবে নোটের ভিত্তিমূল্য ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আজও রিজার্ভ ব্যবস্থাকে বজায় রেখেছে। বাংলাদেশের মুদ্রা আইনেও এই আস্থার কাঠামো নিশ্চিত করা রয়েছে। এই কারণে ব্যাংক নোট কেবল কাগজ নয়; এটি সরকার কর্তৃক প্রতিনিধিক মূল্য বহন করে।

এখন প্রশ্ন আসে—১, ২ ও ৫ টাকার নোট বা কয়েনে কেন এই বাক্যটি লেখা থাকে না? কারণ এগুলোই হচ্ছে মূল মুদ্রা, যাদের পেছনে আর কোনো প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্র নিজেই এদের মূল্যমানের নিশ্চয়তা দেয়। এ কারণে ক্ষুদ্র মূল্যমানের সরকারি মুদ্রায় প্রতিশ্রুতির বাক্য সংযুক্ত করার প্রয়োজন হয় না।

মূলত একটি নোটের গায়ে লেখা কয়েকটি শব্দ দেশের আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করে। এই বাক্যটি জনগণকে জানিয়ে দেয়—তোমার হাতে থাকা কাগজের এই নোটের পেছনে প্রকৃত মূল্য আছে, এবং রাষ্ট্র তার দায়িত্ব স্বীকার করছে। অর্থনীতি অনেক সময় জটিল হয়, কিন্তু টাকার এই বাক্যটি তার সহজ ভাষায় একটি মূল সত্যই জানান দেয়—আমাদের হাতে হাতে ঘুরতে থাকা প্রতিটি নোটের পেছনে রাষ্ট্রীয় আস্থা, সম্পদ ও আইনি প্রতিশ্রুতি অটুটভাবে দাঁড়িয়ে আছে।  


Previous Post Next Post